কুইকপোস্ট নিউজ | বাগেরহাট–যশোর
যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে কয়েক মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল সময়। সামনে অ্যাম্বুলেন্সে শায়িত স্ত্রী ও নয় মাসের শিশুসন্তানের নিথর দেহ। আর ভেতরে দাঁড়িয়ে এক কারাবন্দী—যিনি জীবিত অবস্থায় সন্তানকে কখনো কোলে নিতে পারেননি।
জুয়েল হাসান ওরফে সাদ্দাম। বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগের (নিষিদ্ধ ঘোষিত) সভাপতি। শনিবার সন্ধ্যায় যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের ফটকে তিনি শেষবারের মতো স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা ও শিশু সন্তানের মরদেহ দেখেন। প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়নি তাঁকে। এই ঘটনা ঘিরেই এখন দেশজুড়ে প্রশ্ন—এটি কি কেবল আইনের সীমাবদ্ধতা, নাকি রাষ্ট্রের মানবিকতার ব্যর্থতা?
কীভাবে ঘটল ঘটনা
শুক্রবার দুপুরে বাগেরহাট সদর উপজেলার সাবেকডাঙ্গা গ্রাম থেকে উদ্ধার করা হয় কানিজ সুবর্ণার ঝুলন্ত মরদেহ। একই ঘরে পাওয়া যায় তাঁর নয় মাস বয়সী শিশুসন্তানের নিথর দেহ। স্থানীয়দের সহায়তায় শিশুটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়।
পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে বলা হয়, মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে মা প্রথমে শিশুকে হত্যা করে পরে আত্মহত্যা করেছেন—তবে নিহতের পরিবার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয়। তারা বলছে, ঘটনায় একাধিক অসঙ্গতি রয়েছে এবং নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
প্যারোল কেন হলো না
স্ত্রী ও সন্তানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর পরিবারের পক্ষ থেকে সাদ্দামকে জানাজায় আনার জন্য প্যারোলের চেষ্টা করা হয়। তবে প্রশাসনিক জটিলতায় তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের বক্তব্য—
যেহেতু বন্দী যশোর কারাগারে আছেন, তাই প্যারোলের এখতিয়ার যশোর জেলা প্রশাসনের।
অন্যদিকে যশোর জেলা প্রশাসন ও কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে—
প্যারোলের জন্য কোনো লিখিত আবেদন পাওয়া যায়নি। পরিবারের মৌখিক অনুরোধের প্রেক্ষিতে মানবিক বিবেচনায় কারাফটকে মরদেহ দেখার ব্যবস্থা করা হয়।
এই দুই অবস্থানের মাঝেই পড়ে যায় একটি পরিবার—যারা শেষ পর্যন্ত মরদেহ নিয়ে কারাগারের গেইটে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করে।
‘বাচ্চাকে আর কোলে নিইনি’
সাদ্দামের ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন,
জেলগেটে ভাইয়ের হাতে হাতকড়া ছিল না। কিন্তু তিনি সন্তানের মরদেহ কোলে নেননি।
“ভাই বলেছে—জীবিত অবস্থায় তো কোলে নিতে পারলাম না। এখন নিয়ে কী করব? তারপর বাচ্চার মাথায় হাত রেখে বলেছে, ‘আমি ভালো বাবা হতে পারিনি, বাবা ক্ষমা করিস।’ ভাবিকে বলেছে, ‘ভালো স্বামী হতে পারিনি, ক্ষমা করিস।’”
এরপর কারাফটকের মাটি তুলে নিয়ে কবর দেওয়ার অনুরোধ করেন তিনি।
সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ, প্রশ্ন আর বিবেকের ধাক্কা
ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা—
“মৃত শিশু দেখা করতে গেছে তার জীবিত পিতার সাথে”—এই একটি বাক্য হয়ে ওঠে প্রতিবাদের প্রতীক।
অনেকে প্রশ্ন তুলছেন:
- প্যারোল নীতিমালা কি এতটাই কঠোর যে মানবিক ব্যতিক্রমের সুযোগ নেই
- আবেদন কোথায় হয়েছে বা হয়নি—এই প্রশাসনিক বিতর্কের মূল্য কি একটি শেষ বিদায়ের চেয়েও বেশি
- অতীতে এমন ঘটনা ঘটলেও, নতুন বাস্তবতায় কি কিছু বদলানো উচিত নয়
মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, এটি আইনের চেয়েও বড় করে দেখিয়েছে রাষ্ট্রের নিষ্ঠুর মুখ।
প্রশাসনের ব্যাখ্যা বনাম পরিবারের দাবি
যশোর জেলা প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালের বিবৃতিতে বলা হয়েছে—
প্যারোলের কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়নি, বরং মৌখিক অনুরোধের ভিত্তিতে সীমিত সময়ের জন্য সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু পরিবারের দাবি—
তারা একাধিক জায়গায় গেছেন, আবেদন দিতে চেয়েছেন, কিন্তু কেউ স্পষ্টভাবে দিকনির্দেশনা দেয়নি।
এই দ্বন্দ্বই আজ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
শুধু একটি ঘটনা নয়, বড় প্রশ্ন
এই ঘটনা কেবল একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়।
এটি প্রশ্ন তোলে—
- আইন ও মানবিকতার সীমারেখা কোথায়
- রাষ্ট্র কি কেবল নিয়মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে
- নাকি চরম পরিস্থিতিতে মানবিক ব্যতিক্রমের জায়গা তৈরি করবে
যে প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।





