কুইকপোস্ট | বাংলাদেশ রাজনীতি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। ঠিক এই সময়েই ভারতের মাটি থেকে রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা—এমন তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ভেতরে যাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও দুর্নীতির মামলা রয়েছে, সেই আওয়ামী লীগ নেতারাই বর্তমানে ভারতের কলকাতা ও দিল্লিতে অবস্থান করে দল পুনর্গঠনের পরিকল্পনা করছেন।

ভারতে আশ্রয়, বাংলাদেশে নিষিদ্ধ

দ্য গার্ডিয়ানের অনুসন্ধান অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে হেলিকপ্টারে করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর ৬০০-এর বেশি আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ভারতে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার জনচাপের মুখে আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করে এবং দলটিকে ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ থেকে নিষিদ্ধকরে।

২০২৫ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক মানের বিতর্কিত এক ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে হাসিনা রায়কে “মিথ্যা ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসা” বলে প্রত্যাখ্যান করেন এবং বর্তমানে ভারতের দিল্লিতে আত্মগোপনে রয়েছেন।

দিল্লি থেকে দল চালানোর অভিযোগ

দ্য গার্ডিয়ান লিখেছে, দিল্লিতে অবস্থান করেই শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় নেতাদের সঙ্গে ফোনালাপ করছেন। আওয়ামী লীগ–সংশ্লিষ্ট ছাত্র সংগঠন ও সাবেক মন্ত্রীদের নিয়মিতভাবে কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হচ্ছে—নির্বাচন বয়কট, অস্থিরতা সৃষ্টি এবং ভবিষ্যৎ কৌশল ঠিক করার জন্য।

এক সাবেক ছাত্রনেতা গার্ডিয়ানকে বলেন,

“আমাদের নেত্রী বিশ্বাস করেন, তিনি আবারও বাংলাদেশে ফিরবেন—এবার নায়ক হিসেবেই।”

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন

এই পরিস্থিতি ভারত ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকার একাধিকবার শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চাইলেও ভারত তা উপেক্ষা করেছে।

সম্প্রতি দিল্লিতে শেখ হাসিনার দেওয়া এক বক্তব্যে তিনি আসন্ন নির্বাচনকে “ভাঁওতা” বলে আখ্যা দেন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ক্ষমতা দখলকারী হিসেবে আক্রমণ করেন। এতে বাংলাদেশ সরকারের ক্ষোভ আরও বেড়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়,

“ভারতের রাজধানীতে গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তিকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেওয়া বাংলাদেশের জনগণের প্রতি চরম অবমাননা।”

আওয়ামী লীগের অবস্থান ও সমালোচনা

আওয়ামী লীগ নেতারা দাবি করছেন, তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা বলছেন, নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া হলে সেটি গণতন্ত্রের পরিপন্থী।

তবে দ্য গার্ডিয়ান স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে

  • গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড
  • সংবাদমাধ্যম দমন
  • সাজানো নির্বাচন
  • বিচারব্যবস্থার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ

এসব বিষয়ে জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বহু রিপোর্ট রয়েছে।

ভেতরের স্বীকারোক্তি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাসিত নেতাদের মধ্যেও কেউ কেউ অতীতের ভুল স্বীকার করেছেন। এক সাবেক এমপি গার্ডিয়ানকে বলেন,

“আমরা স্বৈরাচারী ছিলাম, নির্বাচন পুরোপুরি সুষ্ঠু ছিল না—এটা মানতেই হবে।”

তবুও তাদের বিশ্বাস, আসন্ন নির্বাচন ব্যর্থ হলে বা দেশে স্থিতিশীলতা না এলে আওয়ামী লীগ আবারও রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নির্বাসিত আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করছে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কতটা গ্রহণযোগ্য হয়, তার ওপর। নির্বাচন সফল হলে দলটির প্রত্যাবর্তনের পথ কঠিন হবে। আর নির্বাচন ঘিরে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে, সেই ফাঁক দিয়েই ফিরে আসার চেষ্টা করবে তারা।

সূত্র:

দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian), আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম প্রতিবেদন