কুইকপোস্ট নিউজ | সিয়াটল
সিয়াটল—টেকসই আকাশযাত্রার দিকে নতুন করে জোরালো পদক্ষেপ নিল বিমান শিল্পের দুই জায়ান্ট বোয়িং ও জেটব্লু এয়ারওয়েজ। আঞ্চলিক বিমান চলাচলে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড-ইলেকট্রিক জেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জুনাম অ্যারো (Zunum Aero)-তে তারা যৌথভাবে ২৫ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
শিল্প সম্মেলনে ঘোষিত এই বিনিয়োগ এমন এক সময়ে এলো, যখন জ্বালানি তেলের মূল্য ঊর্ধ্বমুখী এবং বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি বাড়ছে। যদিও প্রযুক্তিটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন অনেক বিশ্লেষক।
২০১৭ সালে বোয়িংয়ের HorizonX ও জেটব্লুর Technology Ventures শাখার প্রাথমিক বিনিয়োগে যাত্রা শুরু করা জুনাম অ্যারো লক্ষ্য নিয়েছে ২০২৭ সালের মধ্যে ১২ আসনের হাইব্রিড-ইলেকট্রিক জেট বাজারে আনার। এই বিমানের সম্ভাব্য পাল্লা ধরা হচ্ছে প্রায় ৭০০ মাইল, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ব্যাটারি উন্নয়নের মাধ্যমে ১,০০০ মাইল পর্যন্ত বাড়ানো যেতে পারে।
জুনামের দাবি, তাদের বিমান পরিচালন ব্যয় প্রচলিত আঞ্চলিক বিমানের তুলনায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পারবে। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে অব্যবহৃত প্রায় ১৩ হাজার আঞ্চলিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে বড় হাব বিমানবন্দরের চাপ কমানো সম্ভব হবে।
জুনামের সিইও আশীষ কুমার কুইকপোস্ট নিউজকে বলেন,
“আমরা শুধু বিমান বানাচ্ছি না, আমরা নতুন ধরনের আকাশযাত্রার নেটওয়ার্ক তৈরি করছি।”
২০২৪ সালে ৭৩৭ ম্যাক্স প্রকল্পে বিলম্বের কারণে প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার ক্ষতির মুখে পড়া বোয়িং এই বিনিয়োগকে নিজেদের উদ্ভাবনী ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখছে।
বোয়িং HorizonX-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট স্টিভ নর্ডলুন্ড বলেন,
“বৈদ্যুতিক প্রপালশনই ভবিষ্যৎ।”
তার এই বক্তব্য নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে, কারণ গত মাসে জেট ফুয়েলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪.৫০ ডলার ছুঁয়েছে।
অন্যদিকে জেটব্লু তাদের ভেঞ্চার শাখার মাধ্যমে ১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে এগিয়ে থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারলাইন্সগুলোর ওপর বাড়তি সুবিধা নেওয়াই তাদের লক্ষ্য। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে প্রতিদ্বন্দ্বী ডেল্টা এয়ারলাইন্স ইভিটিওএল (eVTOL) নির্মাতা Joby Aviation-এর সঙ্গে ৬০ মিলিয়ন ডলারের চুক্তি করেছিল।
জুনামের তথ্যমতে, ব্যাটারি ও ডিজেল রেঞ্জ-এক্সটেন্ডার সমন্বিত এই জেট বিমানে যাত্রীপ্রতি কার্বন নিঃসরণ প্রচলিত আঞ্চলিক বিমানের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। ২০২৫ সালেই যুক্তরাষ্ট্রের FAA সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া শুরু করার লক্ষ্য নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি, যেখানে আগেই তারা ১৫ মিলিয়ন ডলারের ফেডারেল অনুদান পেয়েছে।
তবে প্রকল্পটির সময়সূচি নিয়ে সন্দেহ রয়েই গেছে। প্রথমে ২০২২ সালে বিমান বাজারে আনার ঘোষণা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ব্যাটারির ওজন ও স্কেল-আপের সীমাবদ্ধতাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা। বিমান শিল্প বিশ্লেষক রিচার্ড আবুলাফিয়া বলেন,
“এটি একটি সীমিত বাজারের প্রকল্প। বোয়িংয়ের ৭৩৭ বাজারে এর বড় কোনো প্রভাব পড়বে—এমনটা আশা করা ঠিক হবে না।”
শেয়ারবাজারে প্রতিক্রিয়াও মিশ্র। ঘোষণার দিন বোয়িংয়ের শেয়ার ১.২ শতাংশ বেড়েছে, তবে জেটব্লুর শেয়ার ০.৮ শতাংশ কমেছে।
বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে বিমান খাতের অংশ ২ শতাংশ থেকে তিনগুণ বেড়ে যেতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন কর ইতোমধ্যে প্রতি টনে ৭৫ ইউরো ছুঁয়েছে। ভারত ও চীনও অনুরূপ নীতির দিকে এগোচ্ছে।
জুনাম একা নয়। এয়ারবাসের E-Fan X ও জেটব্লু-সমর্থিত Universal Hydrogen-এর মতো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রকল্পও সামনে আসছে। তবে বোয়িংয়ের শিল্পগত শক্তি ও জেটব্লুর বাণিজ্যিক অভিজ্ঞতা এই উদ্যোগকে নতুন গতি দিতে পারে—অথবা এটি আরেকটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী সবুজ প্রযুক্তির স্বপ্ন হয়েই থেকে যেতে পারে।
কুইকপোস্ট নিউজ এই বৈদ্যুতিক আকাশযাত্রার প্রতিটি উড্ডয়ন ও অবতরণ নজরে রাখবে।





