কুইকপোস্ট | সম্পাদকীয়

ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও নাগরিক সমতার প্রশ্ন: জামায়াতে ইসলামী কীভাবে “দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক” ধারণা তৈরি করে

বাংলাদেশ একটি সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে নাগরিকের পরিচয় ধর্ম নয়—নাগরিকত্ব। কিন্তু একটি রাজনৈতিক দল যখন তার নিজস্ব সংবিধানে নাগরিকদের ধর্মের ভিত্তিতে স্তরভাগ করে, তখন সেটি কেবল দলীয় বিষয় থাকে না—তা রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ দর্শনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি একটি হিন্দু রাজনৈতিক গোষ্ঠীর প্রার্থীকে সমর্থন বা মনোনয়ন দেওয়ার মাধ্যমে “অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতি”র বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই অন্তর্ভুক্তি কি নীতিগত, নাকি কৌশলগত?

সংবিধান কী বলছে—স্পষ্ট ভাষায়

জামায়াতে ইসলামীর সংবিধান অনুযায়ী—

  • “রুকন” (পূর্ণ সদস্য) হওয়া যাবে কেবল সেই ব্যক্তিই, যিনি ইসলামের ফরজ–ওয়াজিব পালন করেন এবং ইসলামী আকিদায় বিশ্বাসী
  • অমুসলিম নাগরিকরা কখনোই ‘রুকন’ হতে পারেন না
  • তারা সর্বোচ্চ হতে পারেন “Associate Member”, অর্থাৎ সহায়ক বা সহযোগী সদস্য
  • দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম— আমির, মজলিশে শুরা, কেন্দ্রীয় কমিটি—সবই কেবল রুকনদের দ্বারা গঠিত
  • অমুসলিমদের জন্য রয়েছে আলাদা শপথ, আলাদা কাঠামো এবং সীমিত ক্ষমতা

এই বাস্তবতা দলটির সংবিধানেই সুস্পষ্টভাবে লেখা আছে 

তাহলে রাজনৈতিক অংশীদারিত্ব মানে কী?

একটি রাজনৈতিক দল যখন—

  • রাষ্ট্রক্ষমতায় যেতে চায়
  • সংবিধান সংশোধন, আইন প্রণয়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে চায়
  • কিন্তু একই সঙ্গে তার নিজস্ব দলীয় কাঠামোতে ধর্মভিত্তিক ক্ষমতার স্তর নির্ধারণ করে

তখন সেই দল রাজনৈতিকভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ দিলেও, নীতিগতভাবে সমতা স্বীকার করে না।

হিন্দু বা অন্য ধর্মের কাউকে নির্বাচনে দাঁড় করানো মানেই তাকে সমান রাজনৈতিক মর্যাদা দেওয়া নয়—

যদি সেই ব্যক্তি কখনোই দলের সিদ্ধান্তগ্রহণকারী স্তরে পৌঁছাতে না পারেন।

এটি ঠিক সেই ব্যবস্থার মতো, যেখানে কাউকে ভোট দিতে দেওয়া হয়—

কিন্তু শাসন করার অধিকার দেওয়া হয় না।

“দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক” ধারণা কীভাবে তৈরি হয়

জামায়াতের সংবিধান অনুযায়ী—

  • ইসলামি আকিদা = পূর্ণ রাজনৈতিক আস্থা
  • অন্য ধর্ম = শর্তসাপেক্ষ সহযোগিতা

এই কাঠামোতে রাষ্ট্র গঠিত হলে—

  • মুসলিম নাগরিক হবে নীতিনির্ধারক
  • অমুসলিম নাগরিক হবে “সমর্থক”
  • সমতা থাকবে কাগজে, ক্ষমতা থাকবে বাছাইকৃতদের হাতে

এটাই বাস্তবে Second-Class Citizenship–এর সংজ্ঞা।

আন্তর্জাতিক তুলনা: সবাই এক নয়

ভারতের বিজেপি, ইউরোপের কট্টর ডানপন্থী দল বা অন্যান্য ধর্মপ্রভাবিত রাজনৈতিক শক্তির ক্ষেত্রেও ধর্মীয় পক্ষপাতের অভিযোগ আছে। কিন্তু—

  • বিজেপির সংবিধানে হিন্দু হওয়া বাধ্যতামূলক নয়
  • ইউরোপের ডানপন্থী দলগুলো ধর্ম নয়, জাতীয়তা বা সংস্কৃতির ভিত্তিতে রাজনীতি করে

জামায়াতের ক্ষেত্রে সমস্যা হলো—

ধর্মই সরাসরি রাজনৈতিক যোগ্যতার শর্ত।

এটি আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক।

জামায়াতে ইসলামী চাইলে ধর্মভিত্তিক সামাজিক আন্দোলন হতে পারে।

কিন্তু একটি রাষ্ট্রক্ষমতাকামী রাজনৈতিক দল হিসেবে—

  • নাগরিককে ধর্ম দিয়ে ভাগ করা
  • ক্ষমতার স্তরে ধর্মীয় প্রাচীর তৈরি করা
  • এবং সেটিকে “গণতন্ত্র” বলা

এটি আত্মবিরোধী।

হিন্দু প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়তো নির্বাচনী কৌশল।

কিন্তু সংবিধান না বদলালে, সেই প্রার্থী কখনোই সমান নাগরিক নন—

তিনি কেবল প্রয়োজনের সময়ের সহযোগী।

রাষ্ট্র পরিচালনায় সমতা কেবল স্লোগান নয়—

তা সংবিধানের ভাষায় লিখতে হয়।





সূত্র
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সংবিধান (২০২০ সংস্করণ)